নীল পাহাড় অভিযান ৩

 

নীল পাহাড় অভিযান

( গত পর্বের পর )

আব্দুর রহমান আল হাসান

()

র‌বি‌নের পড়ার টে‌বি‌লে ব‌সে আ‌‌ছে । ক্লাস ফাইভের বাংলা বই তার সাম‌নে খোলা । ‌সে কিছু‌তেই পড়ায় মন বসা‌তে পার‌ছে না । রাস্তায় গা‌ড়ি , ‌‌রিকশা , মটরসাই‌কে‌ল আর বাই-সাই‌কে‌লের ক্রিং ক্রিং শ‌ব্দে তার পড়ায় বিঘ্ন ঘট‌ছে । র‌বি‌নের বাবা জামাল সা‌হেব ওয়েটিংরুমে ব‌সে অফিসের কাজ কর‌ছেন । সে তার বাবার নিকট যায় । জামাল সা‌হেব তার দি‌কে জিজ্ঞাসু দৃ‌ষ্টি‌তে তাকা‌লেন । র‌বিন বল‌‌‌‌লো , বাবা, বা‌হি‌রে গা‌ড়ি-‌ঘোড়ার শ‌ব্দে পড়‌তে পার‌ছি না । ঢাকায় আমার কিছু‌‌তেই ভা‌লো লাগ‌ছে না ।‌ তু‌মি চাকু‌রি বদল ক‌রে গ্রাম‌ে চ‌লো  

জামাল সা‌হেব ছে‌লে‌‌কে কা‌ছে টে‌নে বসা‌লেন । বল‌লেন ,

বাবা , লেখাপড়ার জন্য জীব‌নে কিছু কষ্ট কর‌তে হয় । ঢাকায় তো ত‌ুমি মাত্র নতুন এসেছতাই তোমার কষ্ট হ‌চ্ছে । কিছু‌দিন যাক , তারপর তু‌‌মি অভ্যস্ত হ‌য়ে পড়‌বে । এরপর তি‌নি ছে‌লে‌‌কে তার ছোট‌বেলার কা‌হিনী শুন‌া‌লেন । বল‌লেন

আ‌‌মি যখন ক‌লে‌জে স‌বেমাত্র ভ‌র্তি হই তখনই দে‌শে যুদ্ধ ‌লে‌গে যায় । আমি তখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম । আমরা তখন প্রায়ই ঢাকা বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে আসা-যাওয়া করতাম । শেখ মু‌জিব তখন বাংলার অসহায় মান‌ু‌ষের আশার আলো ছিল । কিন্ত‌ু তৎকালীন পা‌‌কিস্তানীরা তা‌‌কে একদমই সহ্য কর‌তে পার‌তো না । ‌তি‌নি সে সময় তি‌নি প্রায়ই জে‌লে থাক‌তেন । পা‌কিস্তান সরকার তা‌কে কো‌নো এক নি‌‌র্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত ক‌রে কারাগা‌রে ‌প্রেরণ ক‌রে ।  ‌দোষমুক্ত হ‌য়ে যখন শেখ সা‌হেব কারাগার ‌থে‌কে বের হন , জেল গে‌টেই তখন আরেক মামলার আসামী হ‌য়ে আবার জে‌লে ডু‌কেন ।এভা‌বে চল‌তে থা‌কে মা‌সের পর মাস । সন ১৯৬৯ পে‌রি‌য়ে ১৯৭০ আসেকা‌লের চাকা ঘু‌রে আসে ১৯৭১ শুরু হয় বাঙ্গালী জা‌তির সংগ্রাম । বছ‌‌রের শুরু থে‌কেই পা‌‌কিস্তা‌‌নীদের অরাজগতা আর  "৭০ এর নির্বাচন" নি‌য়ে ব্যাপক আ‌লোচনা ও সমাল‌োচনা চল‌তে থা‌কে । এরইমা‌‌ঝে ক‌‌‌য়েকবার ঢাকা অব‌রোধ দেয়া হয় । আমা‌‌দের ইউ‌নিভ‌ার্সি‌টি‌তে ক্লা‌সের অবস্থা ছিল , এই হ‌তো এই হ‌তো না । এরইমা‌‌ঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল‌য়ের ছাত্ররা ‌শেখ ম‌ুজিব‌কে " বঙ্গবন্ধু " উপাধী দেয় । মার্চ মা‌সের শুরু‌তে শোনা যায় , রেস‌কোর্স ময়দা‌নে বঙ্গবন্ধু ভাষণ ‌দি‌‌বেন । ৭ ই মার্চ‌ের সকাল থে‌কে রেস‌কোর্স ময়দা‌নে লোকজন জ‌ড়ো হ‌তে থা‌কে । ঢাকা,গাজীপুর,কু‌‌মিল্লাসহ আরো অনেক দূর-দূরান্ত থে‌কে লোকজন আস‌তে থা‌কে । আমরাও ইউ‌নিভ‌া‌র্সি‌টি থে‌কে গি‌য়ে‌ছিলামবেলা ১১ টার দি‌কে শেখ মু‌জিব ভাষণ শুরু ক‌‌রেন । "ভাই‌য়েরা আমার , আজ দুঃখ ও ভারক্রান্ত হৃদয় ‌নি‌য়ে আপনা‌দের সাম‌নে হা‌জির হ‌য়ে‌ছি । আপনারা সবই জা‌নেন এবং বো‌ঝেন । এভা‌বে ভাষণ চল‌তে থা‌কে । শে‌ষে তি‌নি হানাদার‌দের প্রতি‌‌রোধ কর‌তে ব‌লেন । এই ভাষ‌ণের পর শেখ ম‌জিব‌কে আবার গ্রেফতার করা হয় । ঢাকায় তখন লোকজন রাস্তা অব‌রোধ ক‌রে রা‌খে । ২৫ শে মার্চ রা‌তে বাঙ্গালীরা রাস্তা অব‌রোধ ক‌রে রে‌খে‌ছিল । এমন সময় সেনাবা‌হিনীরা হঠাৎ আক্রমণ ক‌রে । পু‌রো ঢাকায় তারা জাহান্নাম কা‌য়েম ক‌রে । তারা সেটার নাম দেয় " অপা‌রেশন সার্চলাইট " প‌রেরদিন ২৬ মা‌র্চে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় । 

র‌বিন ‌জিজ্ঞাসা ক‌রে ,বাবা ,তখন থে‌কেই কি ‌তোমরা যুদ্ধ শুরু ক‌রো ?

জামাল সা‌হেব বল‌লেন , হুম । 

: তু‌মি  তখন কি ক‌রে‌ছি‌লে

: যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই আমি ঢাকা ত‌্যাগ ক‌রি । আমা‌দের বাড়ী ছিল শ‌রীয়তপুর । গ্রা‌মে যে‌তে তখন খুব কষ্ট হ‌য়ে‌ছি‌লো । রাস্তায় গাড়ী নেই । নদী‌তে লঞ্জ নেই ।  বু‌ড়িগঙ্গা নদী‌তে তখন এত প‌রিমা‌ণে লাশ ভ‌েসে উ‌ঠে‌ছিল যে , লা‌‌শের কার‌ণে নদীর পা‌‌নি দেখা যেত না । 

র‌বিন এ কথা শু‌নে খুবই চি‌ন্তিত‌বোধ ক‌রে ।" এত লোক যু‌দ্ধে মারা গি‌য়ে‌ছে ? যাক , তার বাবা বে‌চে ছি‌লেন । " ম‌নে ম‌নে ভা‌বে সে । র‌বি‌নের বাবা বল‌তে লাগ‌লেন , শে‌ষে আম‌ি শরীয়তপু‌রে অনেক কষ্ট ক‌রে পৌছাই । আমার বাবা-মা আমা‌কে যু‌দ্ধে ‌যে‌তে দি‌বে না‌‌কি তা নি‌য়ে আমি খা‌নিকটা চি‌ন্তিত ছিলাম । প্রথ‌মে ভাবলাম , তা‌দের না জা‌‌নিয়ে চ‌লে যাই । ‌কিন্তু পরক্ষণে বি‌বে‌কের কা‌ছে বাধাপ্রাপ্ত হলাম কারণ , আ‌‌মি ছিলাম প‌রিব‌া‌রের বড় ‌ছে‌লে । অব‌শে‌ষে আমি বাবা-মা‌য়ের সা‌থ‌ে  এ বিষ‌য়ে আ‌লোচনা করার ইচ্ছা করলাম । কিন্তু আমি কো‌নো সু‌যোগ পা‌চ্ছিলাম না । হঠাৎ ক‌রেই এক‌টি সু‌যোগ পে‌য়ে গেলাম । 

 

()

আমার বাবা এক‌দিন ঘ‌রে এসে বল‌লেন , জামাল ,শুনলাম  পা‌শের গ্রা‌মের অনেকেই যু‌দ্ধে যা‌‌চ্ছে । আ‌মি চাই , তু‌মিও যাও । 

এ কথা শু‌নে আমি খুবই খু‌শি হলাম । কিন্তু বাধ সাধ‌‌লেন আমার মা । ‌তি‌নি বল‌‌লেন , য‌দি তু‌মি যু‌‌দ্ধে মারা যাও , তাহ‌‌লে কি হ‌বে তখন আমার আব্বা মা‌কে বল‌লেন , য‌দি ত‌ুম‌ি  ‌নি‌জের ছে‌লে‌কে এভা‌বে আটকাও , তাহ‌লে আর এই দেশ স্বাধীন হ‌তে পার‌বে নাবাবা মা‌কে বু‌ঝি‌য়ে রাজী করা‌লেন । পরদিন সকালে আমি ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম । টানা চার মাস ট্রেনিং শেষে নভেম্বরের দিকে আমরা ঢাকা আসলাম । ঢাকায় তখন আমরা গেরিলা আক্রমণ করতাম । পাশাপাশি ঢাকা-গাজীপুর রোড , ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে আমরা পাকিস্তানীদের আক্রমণ করতাম। এভাবে ১৫ই ডিসেম্বর চলে আসলো । শুনতে পাচ্ছিলাম দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে । ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পন করবে । ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পন করে । আমরা পাই , একটি মুক্ত স্মাধীন ভূ-খন্ড এবং নিজস্ম পতাকা । এতক্ষণ রবিন তার বাবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। সে তার বাবাকে বললো , আচ্ছা , ৭১ সালের ঢাকা আর বর্তমানের ঢাকার মধ্যে পার্থক্য কতুটুকু ?

জামাল সাহেব বললেন , সে সময় তো ঢাকায় গাছ-গাছালী ভরপুর ছিল । এখন তো ঢাকায় সে সব আর নেই । ঢাকায় এখন বিশাল বড় বড় বিল্ডিং তৈরী হয়েছে ।

আচ্ছা রবিন , অনেকক্ষণ তো আমরা গল্প করলাম । চলো রাতের খাবার খেয়ে আসি । তোমার আম্মু অপেক্ষা করছে । পরদিন সকালে রবিন স্কুলে গেল। তার ক্লাসের অন্যান্যদের সাথে সে পরিচিত হলো। এতে বন্ধুর সংখ্যা আরো বেড়ে গেল । ক্লাসের অন্যান্যদের সাথে সে পরিচিত হলো। এতে বন্ধুদের সংখ্যা আরো বেড়ে গেল । ক্লাসে সে আহমাদের সাথে বসলো । আহমাদ রবিনকে বললো , আচ্ছা রবিন, তুমি কি গল্পের বই পড়ো ?

রবিন বললো, হুম

: কি কি গল্পের বই তুমি পড়েছ  ?

: মা, ফেলুদা, হিমু  , তিন গোয়েন্দাসহ আরো অনেকগুলো।

: ওয়াও, তাহলে তো অনেকগুলো পড়েছ । জানো, আমার বাবা হলেন লাইব্রেরীয়ান। আমাদের বাসায় এমন কোনো গল্পের নেই , যেটা আমাদের নিকট নেই ।

: সত্যি, তাহলে তো তোমার থেকে আমার বই ধার নেয়া দরকার ।

এ কথা শুনে আহমাদ হেসে বললো , অবশ্যই । আমার আরো দুই-তিনজন বন্ধু রয়েছে , যারা আমার থেকে বই নেয় । রবিন তাকে একটা বইয়ের নাম বলে বললো , এটা তুমি কাল নিয়ে এসো।

এভাবে একদিন দুইদিন করে দীর্ঘ ছয়মাস চলে গেল । আহমাদসহ রবিনের আরো অনেক বন্ধু হয়ে গেল । একদিন স্কুল থেকে ঘোষণা দেয়া হলো , স্কুলেন অধীনে সবাই এক সপ্তাহের ট্যুরে যাবে । এ কথা শুনে রবিন খুব খুশি হলো। ঢাকায় এতদিন খাচাঁর মধ্যে আটঁকে থাকার পর এবার মুক্তভাবে ৬-৭ দিন থাকা যাবে । এখনো স্কুল থেকে জানানো হয় নি , তারা কোন জেলায় যাবে । রবিন চাচ্ছে , খাগড়াচড়ি যেতে । সেখানে অনেক পাহাড় আছে সে প্রিন্সিপ্যাল স্যারর নিকট গেল । স্যার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন , কিছু বলবে রবিন ?

: স্যার , শুনলাম স্কুল থেকে নাকি ট্যুরে যাবে ?

: হুম । তোমরা কিছুদিন ঢাকার বাহিরে থাকলে ব্রেন পরিস্কার হবে ।

: কিন্তু স্যার কোন জেলায় যাওয়া হবে ?

: এই তো চট্টগ্রামের ঐই সাইটে যাবো ।

: স্যার , আমরা পাহাড় দেখতে চাই ।

: আচ্ছা , তোমাদের পাহাড় দেখতে নিয়ে যাবো ।

রবিন খুশি হয়ে ফিরে গেল । সে তার সহপাঠী বন্ধুদের এই সংবাদটা দিলো । একজন বললো ,

আচ্ছা আমরা পাহাড় দেখতে গিয়ে যদি কোনো মিশন পরিচালনা করি  , তাহলে কেমন হয় ?

সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো , কিসের মিশন ?

সে বললো , পাহাড়ের মধ্যে অনেক সময় ডাকাতরা আস্তানা গেঁড়ে রাখে । আমরা ঐ ডাকাতদের ধরবো । এটা শুনে সবাই ভয়ে ভয়ে বললো , না ভাই । আমরা এই মিশনে নেই । ডাকাতদের কাছে ভয়ঙ্কর অস্ত্র থাকে সেই অস্ত্র ‍দিয়ে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে


পর্ব 2 পড়তে  এখানে ক্লিক করুন 

#buttons=(আমি সম্মত !) #days=(20)

আসসালামু আলাইকুম, আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমার সম্পর্কে আরো জানুনLearn More
Accept !